Wednesday, August 24, 2016

জাতি রক্ষার তাগিদে সমাজ এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার প্রত্যাশায়


লেখাটিকে আজও প্রাসঙ্গিক মনে হয়। যথার্থ গুরুর অধীনে যথাযথ প্রশিক্ষণ ছাড়া কেবল সরল বিশ্বাসকে পুঁজি করে ভিক্ষু হওয়া ভান্তেদেরকে যারা নিন্দা, ঠাট্টা করে দুঃশীল বলে তারা একটু সময় নিয়ে এই লেখাটি পড়তে পারেন। হয়ত মোহ কেটে গেলেও যেতে পারে।




কিছুদিন আগে মায়ের প্রথম মৃত্যু বার্ষিকীর পুণ্যদান অনুষ্ঠানে গ্রামে গিয়েছিলাম। অনুষ্ঠানটি হওয়ার কথা ছিল ৩১শে অক্টোবর কিন্তু ভিক্ষু সংখ্যা সংকুলান না হওয়াই ০১লা নভেম্বরে তা অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠান সমাপনের পরেও বেশ কটা দিন ছিলাম বাড়িতে। ছোটবেলা থেকেই দেখে আসা আমার সেই চিরচেনা সবচেয়ে অনগ্রসর গ্রামটি আবার নতুন করে জরিপ করলাম । কথা হল অনেকের সাথে। মায়ের পুণ্যানুষ্ঠানে আসা পাঁচ জন ভান্তের সাথেও কথা হয়েছিল অনেক্ষণ নানা বিষয় নিয়ে। তাঁরা বয়সে সবাই আমার থেকে বড়, তবে ভিক্ষু বর্ষায় মাত্র একজন ভান্তে সিনিয়র হন আমার থেকে(স্থবির)।
পঁয়তাল্লিশ থেকে পঞ্চাশোর্ধ এসব ভান্তেরা প্রায় সবাই গৃহী জীবন থেকে ভিক্ষু জীবনে এসেছেন জীবনের বাকি সময়টুকু যথাসম্ভব বুদ্ধ প্রদর্শিত পথে কাটিয়ে দেয়ার জন্য। তাঁরা সকলেই স্বল্পশিক্ষিত বা অতি অল্প অক্ষর জ্ঞান সম্পন্ন। সাংসারিক মোহময় জীবনের ক্লান্তির পর তা থেকে বিমুক্তির প্রত্যাশা তাঁদের চোখে মুখেই যেন প্রতিফলিত হতে দেখা যায়। তাঁরা কেউই ধর্ম দেশনায় এত পারঙ্গম নয়। অক্ষর জ্ঞান না থাকা ও বই এবং দক্ষ গুরুর অভাবে ধর্মের মৌলিক বিষয়ের অনেক কিছুই তাঁরা জানেন না। শুধু সরল চিত্তের আগ্রহ ও বিশ্বাসে তাঁরা নিজেদের মত করে বুদ্ধ, ধর্ম ও সংঘের শরণে আশ্রয় নিয়েছেন। তাঁদের দেখে অনেকের অনেক ধরনের চিন্তা মনে জাগ্রত হতে পারে। কেউ কেউ তাঁদেরকে ঠাট্টা, মস্করা, অবজ্ঞা এমনকি নিন্দাও করতে পারেন এই বলে যে- তাঁরা দুঃশীল, বকধার্মিক, মূর্খ, গোঁড়া, লোভী, বসে বসে খাওয়ার জন্য ভিক্ষু হয়েছে ইত্যাদি। কিন্তু আমার মনে এসেছে অন্য ভাবনা। আর তা হচ্ছে- এই মাঝ বয়সী সরল, স্বল্প/অশিক্ষিত ভান্তেরা যদি প্রশিক্ষণ পেত যথাযথভাবে কোন ভিক্ষু ট্রেনিং সেন্টার থেকে কোন ধর্মীয় ও আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত গুরুর মাধ্যমে, তাহলে তাঁরা নিশ্চয় সেই শিক্ষা/জ্ঞান স্ব স্ব বিহারের আওতায় থাকা কচি-কাঁচা ছেলেমেয়েদের মানবিক মূল্যবোধের উন্নয়নে তাঁদের মেধাকে বেশি করে কাজে লাগাতে পারতেন। হতে পারতেন এক এক জন সমাজ প্রগতির বিপ্লবী কর্মী।
আমাদের নব প্রজন্মের শিক্ষিত ছেলেমেয়েরা আজকাল আরজ আলী মাতুব্বর পড়ে আরজ আলী হতে চায়, প্রবীর ঘোষ পড়ে হতে চায় তথাকথিত সামাজিক কুসংস্কারের চ্যালেঞ্জকারী সোজা মেরুদণ্ডের মানুষ, কিংবা অভিজিৎ রায়, আসিফ মহিউদ্দিন পড়ে পরতে চায় মুক্তমনার রঙচঙা পোশাক। কেউবা মার্ক্স, লেনিন, মাও, হো এর দুয়েক পাতা পড়ে কম্যুনিজম ও নাস্তিক তত্ত্বের লাঙ্গল দিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামে বিপ্লবী কর্ষণ করতে করতে অস্তিত্ত্বের শেকড় গন্ধসুদ্ধ উপড়ে ফেলতে চায় আধুনিক গণমাধ্যম ফেইসবুক কিংবা ব্লগে।
জাতি রক্ষার তাগিদে সমাজ এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার প্রত্যাশায় বর্তমান বিপ্লবের ময়দান শুধু মাত্র অনলাইন বা মিটিং মিছিলের রাজপথকে না ভেবে আমরা কি এসব নীরব সামাজিক বিপ্লবীদের আমাদের অর্জিত শিক্ষা দিয়ে সহযোগিতা করতে পারি না? তাঁরা অল্প শিক্ষিত, অশিক্ষিত তো কি হয়েছে, আমি বা আমরা তো কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে আধুনিক শিক্ষা পেয়েছি। সেই শিক্ষা নিশ্চয় তাঁদেরকে নিন্দা-ঠাট্টা করার জন্য অর্জন করিনি, করেছি তাঁদের স্বল্প জ্ঞানে বুদ্ধি-শক্তিতে সমাজকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার নিরন্তন সংগ্রামকে বেগবান করতে। আমরা কেন ভুলতে বসেছি যে নালন্দা, তক্ষশীলার মত জগত খ্যাত বিদ্যাচর্চার কেন্দ্র গড়ে তুলেছিল এই ভিক্ষুরাই এককালে। বাংলা ভাষার আদি নিদর্শন চর্চাপদও গোঁড়ামি মুক্ত জ্ঞানালোক সন্ধানী বৌদ্ধ ভিক্ষুরাই রচনা করেছিলেন। সেই মহান আদর্শের ধ্বজাধারী ভিক্ষু সংঘরাই তো আজ আমাদের মোনঘর, বনফুল, গিরিফুল, পার্বত্য বৌদ্ধ মিশন, কাচালং শিশু সদনসহ নানা সামাজিক প্রতিষ্ঠান উপহার দিয়ে সমাজ প্রগতির সংগ্রামকে ত্বরান্বিত করছেন। জুম্মদের পক্ষে দূত হয়ে জাতিসংঘে ভাষণ দিচ্ছেন।
মাঠ পর্যায়ে থাকা এইসব ধর্মীয় সংগঠকদের মাঝে যদি আমাদের অর্জন করা আধুনিক শিক্ষা পৌঁছে দিতে পারি তখন তা তারা সাধারণের অন্তরে পৌঁছাবে। আধুনিক শিক্ষার উপাদানগুলো ঠিক এভাবেই প্রবাহিত করতে হবে তৃণমূল পর্যায়ে, বিদ্যমান ধর্মীয় মিডিয়ার মাধ্যমে। তথাকথিত নাস্তিকতার ফ্যাশান, বিজ্ঞান মনস্কতার ফ্যাশান, প্রগতিশীল সেক্যুলার বিপ্লবী ব্লগার সেজে অনলাইন ও চায়ের কাপে ঝড় তুলে, তির্যক ভাষায় গণহারে বৌদ্ধ ভিক্ষুদের সমালোচনার নামে ঠাট্টা-নিন্দা করে শুধু জনবিচ্ছিন্ন হওয়া যাবে কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হবে না। সত্যিকারের বিপ্লবী হতে হলে জনগণের অন্তরের ভাষা বুঝতে হবে, তা আয়ত্ব করতে হবে এবং সেই অনুযায়ী কাজ করে যেতে হবে। জনচিন্তা ও জন ইচ্ছার বিপরীতে কখনোই কোন ধরনের বিপ্লব হয়নি, হবেও না। জনগণের এই ভাষা বুঝে মহান ভিক্ষুরা(কিছু ব্যাতিক্রম বাদে)। তাই তাঁরা সেই অনুসারে কাজ করে যাচ্ছে নীরবে। তাঁদেরকে নিন্দা-ঠাট্টার বদলে সহযোগিতা করলে সমাজ জাতি উপকৃত হবে বৈকি।
ভবতু সব্ব মঙ্গলম
০৭/১১/২০১৪ইং

0 comments:

Post a Comment